বাকিলায় জ্বরের রোগীকে মানসিক রোগের ওষুধ! জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক শিশু
হুমায়ূন কবির:
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বাকিলা বাজারে ভুল ওষুধ সেবনের কারণে এক ১২ বছরের শিশুর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সেনা ক্যাম্প এবং হাজীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ৭ জুলাই সকালে রাধাসার (পাঠানবাড়ী) এলাকার মোঃ আরাফাত পাঠান নামে এক শিশু জ্বরে আক্রান্ত হলে তার মা মোসাঃ জান্নাত আক্তার তাকে নিয়ে বাকিলা বাজারের ‘শুভ মেডিকেল হল’-এ যান। ওষুধ দোকানটির মালিক গৌতম কুমার দাস একজন কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট হলেও নিয়মিত নিজ হাতে প্রেসক্রিপশন দিয়ে থাকেন বলে জানা গেছে।
এদিন তিনিও শিশুর জন্য প্রেসক্রিপশন লিখে নিজ দোকান থেকেই ওষুধ সরবরাহ করেন। ওষুধ সেবনের কিছুক্ষণ পরই শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তার চোখ বাঁকা হয়ে যায়, জিহ্বা বেরিয়ে আসে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
তড়িঘড়ি করে তাকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে শিশুটিকে কুমিল্লা মুন হাসপাতাল, গ্রীনলাইফ হাসপাতালসহ পাঁচটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে যে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল তা মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ব্যবহৃত মানসিক রোগের ওষুধ। এই ওষুধ শিশুদের শরীরে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এতে তার স্নায়ুবিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে চিকিৎসা বাবদ পরিবারটির প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিশুর চাচা ও সিঙ্গাপুরপ্রবাসী শাহাদাত পাঠান বলেন, “আমার ভাতিজা শুধু জ্বরে ভুগছিল। অথচ তাকে দেওয়া হলো পাগলের ওষুধ! ওষুধ খাওয়ার পর সে পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে। এক হাসপাতাল থেকে আরেকটায় দৌড়েছি, ওর চোখ-মুখ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্ষতিপূরণের কথা বলতেই অভিযুক্ত গৌতম কুমার দাস ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পরিবারকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন।
অভিযুক্ত গৌতম কুমার দাস বলেন, “আমার জায়গা থেকে এই চিকিৎসা দেওয়া ঠিক হয়নি। ভুল হয়ে গেছে।”
এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আহমেদ তানভীর বলেন, “এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে আমি যে প্রেসক্রিপশন দেখেছি, সেটি শিশুদের জন্য একেবারেই উপযোগী নয়। এটি মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ওষুধ, যা খুব সাবধানে ও অভিজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া কেউ লিখতে পারে না। একজন কেমিস্ট কীভাবে প্রেসক্রিপশন লিখতে পারেন, সেটাও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।”
হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মহিউদ্দিন ফারুক বলেন,“ অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইবনে আল জাহিদ হোসেন বলেন, “বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোষী প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ভুক্তভোগী পরিবার প্রশাসনের কাছে চিকিৎসার যাবতীয় কাগজপত্র, প্রেসক্রিপশন ও বিল সংযুক্ত করে অভিযোগ জমা দিয়েছেন এবং অভিযুক্ত গৌতম কুমার দাসের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।